Let's Discuss!

সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য
#2000
আজ একজন বিমান ছিনতাইকারীর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। আমি নিজেও উনাকে চিনতাম না, কখনো কোথাও শুনিনি, পড়িনি, জানিনি। বিষয়টি আমার নজরে এলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি গল্প লিখতে কিছু তথ্যের জন্য যখন অন্তর্জালে ঘুরাঘুরি করছিলাম। হঠাৎ একটা পেপারে উনার কথা জানলাম। তুমুল আগ্রহ সৃষ্টি হলো উনার ব্যাপারে। কিন্তু ভীষণ মর্মাহত হয়েছি, যখন অনেক ঘাটাঘাটি করেও এই ছিনতাইকারীকে নিয়ে বিশেষ কিছু পেলাম না। অথচ এমনটি হওয়া উচিত হয়নি আমি মনে করি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল এই জাতির সাথে সেই ছিনতাইকারী কে পরিচয় করিয়ে দেয়া। জানি না কেন তা হয়নি। কমেন্টে কিছু রেফারেন্স দিয়েছি, সেখান থেকে পাওয়া তথ্যগুলোই এখানে সাজিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। এই বিষয়ে হয়ত অন্য আরো অনেক তথ্য, অথবা ভিন্নতর কোনো তথ্যও আছে। যতটুকু জেনেছি আপাতত ততটুকু না লিখে পারছি না, স্বাধীন বাংলাদেশের একজন লেখক হয়ে ।

তিনি জ্যা কুঁয়ে, ২৮ বছর বয়সের টগবগে একজন ফরাসী যুবক। তিনি ছিনতাইকারী! ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল; পাকিস্তান এয়ার ওয়েজের ৭২০বি উড়োজাহাজটি ফ্রান্সের ওর্লি বিমানবন্দর থেকে ছিনতাই করলেন!

দীর্ঘদিন ধরেই জ্যাঁ কুয়ে পরিকল্পনা করছিলেন কিভাবে এমন অপারেশনটি সফল করবেন! অনেক গবেষণার পর মনস্থির করলেন সে সময়েই বিমানটিকে ছিনতাই করতে হবে, যখন এয়ারপোর্টের তাবত কর্মকর্তা কর্মচারী বিশেষ কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। যখন মানুষ মনেপ্রাণে কিছু কামনা করেন তখন সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং কাউকে কি ফিরিয়ে দিতে পারেন! তাই তেমন একটি ব্যস্ততম দিনও পেয়ে গেলেন জ্যাঁ কুয়ে।

বিমান বন্দরটিতে সেদিন আসার কথা জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডিট এবং ফরাসী রাষ্ট্রপতি পম্পিডু। দু'জনকে ভিআইপিকে নিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা ব্যস্ত তটস্থ থাকবে, আর সে সুযোগেই তিনি ঢুকে পড়বেন এটাই ছিল তাঁর প্রাথমিক পরিকল্পনা। কৌশল অনুযায়ী সফলও হলেন তিনি।

পাকিস্তানের পি আই এ'র ৭২০ বি উড়োজাহাজটিতে যাত্রীবেশে ঢুকে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ককপিটে ঢুকে পাইলট আর কো পাইলটের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে ঘোষণা দিলেন বিমানটি ছিনতাই হয়েছে এবং কেবলমাত্র তাঁর দাবী পূরণ করা হলেই বিমানটি রক্ষা পাবে। এ সময় জ্যাঁ কুয়ে'র বুকে ছিল একটি ব্যাগ, জানালেন সেটিতে আছে ক্ষমতাশালী আস্ত বোমা। তিনি দাবী পূরণ না করে হলে সেটিতে চাপ দিয়ে যাত্রীসহ বিমানটি উড়িয়ে দেবেন, জানিয়ে দিলেন।

২৮ বছরের একজন যুবক ছিনতাইকারী। তার দাবী আর কিইবা হতে পারে! কাড়ি কাড়ি টাকা, সম্পদ এই তো! কিন্তু সকলেই ভীষণ হতবাক হয়ে পড়ল যখন তাঁর দাবীকৃত মুক্তিপণের ব্যাপারে শুল। বিমানটিকে মুক্তির পণ হিসেবে তিনি যা চেয়েছিলেন সেটা সেদিনের প্রক্ষাপটে, মানব ইতিহাসের প্রক্ষাপটে তো অবশ্যই অতি আশ্চর্যের বিষয়। জ্যাঁ কুয়ে প্রচার মাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানী হানাদার আর তাদের দোসরদের ভয়ে বাংলাদেশ নামে একটি পরাধীন দরিদ্র দেশের লক্ষাধিক মানুষ ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কুঁয়ে নামের এই বিমান ছিনতাইকারী, ছিনতাইকৃত বিমানটির বদলে চাইলেন এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য, হ্যাঁ মানুষের জন্যই— ২০টন ঔষধ (মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ঠ দ্রব্যাদি) এবং যথাযথ পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের খবর বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে এই তরুণটির প্রাণ বারবার উঠেছিল কেঁপে কেঁপে। আকুলপারা হয়েছে তাঁর মন এই মানুষগুলোর মানবেতর জীবনের কথা ভেবে, অথচ একবারও ভাবেননি যে ভয়াবহ কাজটি তিনি করতে চলেছেন তার পরিমাণ কতটা ভয়ংকর হতে পারে তাঁর জীবনে। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন ধরা পড়লে অথবা ব্যর্থ হলে তাঁর নিয়তি। জানতেন কাজটিতে ঝুঁকির মাত্রাও।

তবুও জ্যাঁ কুয়ে নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারেননি। হাজার মাইল দূরের ভিনদেশী এই ফরাসী তরুণ, অজানা অচেনা এক পরাধীন বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাঁর জীবন বাজি ধরলেন। মানবিকতা এবং তিনি মানুষ, এ ছাড়া তাঁর আর কোনো দায়িত্বই ছিল না। ভাবা যায় চেনা নেই, জানা নেই এমন কিছু মানুষের কথা ভেবে তিনি এই দুর্ধষ্য কাজটি করে ফেললেন!

কথা রাখা হবে, এই আশ্বাস দিয়ে রেডক্রসের কর্মী এবং উড়োজাহাজের টেকনিশিয়ান হিসেবে দুইজন কর্মী প্লেনে ঢুকল। আসলে তারা ছিল ছদ্মবেশী পুলিশ। শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হলো, এক পর্যায়ে গ্রেফতার হলেন কুঁয়ে। বুকে ছোট ব্যাগ যেটাতে বোমা আছে বলে দাবী করেছিলেন আর তাঁর দাবী পূরণ করা না হলে সেটি বিস্ফোরণ ঘটাবেন বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, সেটি উদ্ধারের পর দেখা গেল, দুটো ডিকশনারি ও একটি বাইবেল।

মহান বীর জ্যাঁ কুঁয়ে। তাঁর বিচার করা হবে, এই মর্মে ঘোষণা দেওয়া হলো। কিন্তু সে সময়ে যত সাক্ষী ছিলেন এবং যারা এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাঁরা প্রত্যেকে সাক্ষ্য দিলেন, জ্যাঁ কুঁয়ে যা করেছেন তা মানবতার জন্য, মানুষের জন্যই। কারো ক্ষতি করেননি এবং আদতে তা করতেও চাননি, সে উদ্দেশ্য তাঁর ছিলও না। তবুও শেষ রক্ষা হলো না। ফরাসী সরকার তাঁকে ৫ বছরের কারাদন্ড দিল। কারা ভোগ করে বের হবার পরও জ্যাঁ কুয়ে বসে থাকেননি। মানবতার জন্য তিনি দৌঁড়েছেন ভারতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বেই। জ্যাঁ কুঁয়ের এই মহতী অভিযানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ফরাসী রেডক্রস এবং Knights Hospitaller মাল্টা, বাংলাদেশকে ২০ টন মেডিকেল সরঞ্জাম ত্রাণ হিসেবে পাঠিয়েছিলও।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের কত তরুণ, কত নাগরিক যে রাজাকার, আল-বদর, আল শামসদের সাথে মিলেছিল তার ইয়ত্তা নেই! কি বিভৎস, কি নষ্ট ছিল সেসব কর্মকান্ড। পাক হানাদারদের হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দিয়েছিল নিজ দেশমার্তৃকার মা বোন বাবাকে, মুক্তির মহান যোদ্ধাদেরকে। তারা খুন করেছে, লুটতরাজ চালিয়েছে, ধর্ষণ করেছে। বাংলাদেশী লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষের সাথে করেছে নির্মম ও কাপুরুষীয় বিশ্বাস ঘাতকতা। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরের একজন ফঁরাসী যুবক, একজন জ্যাঁ কুয়ে, তাঁর ভাবনায় মানুষ হিসেবে মানুষকে মহান করে।

আমরা লজ্জিত, আমরা জাতি হিসেবে ভীষণ অভাগা বীর কুয়ে।আপনার মতো একজন মহান বীরকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানের কিছুই দিতে পারিনি। না পেরেছি আপনার স্মৃতির চর্চা করতেও। সেই অবদানকে স্মরণ করে কোনোদিন কোনো সভা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এই জাতির জাতীয় বীর হিসেবে কোথাও কোনো পাঠ্যপুস্তকে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে কিনা সেও আমার জানা নেই। হে মহান বীর, আপনাকে পাইনি এ দেশের ইতিহাসে, এ দেশের স্মৃতির কোনো মিনারে। কেন তাও জানা নেই। আমাদের এই ক্ষুদ্রতা, এই অক্ষমতা আপনি ক্ষমা করবেন মহান বীর।

আজ, এই দেশের মধ্য প্রভাতে দাঁড়িয়ে, প্রজন্মের একজন লেখক হিসেবে অবনত মস্তকে আপনাকে স্যালুট জানাচ্ছি জ্যাঁ কুঁয়ে। আমাদের অন্তরের অন্তস্তল হতে, এই বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্ত মানুষের ভালোবাসা, সম্মান এবং হৃদয় গ্রহণ করুন, প্রিয় বীর। শুধু এই দেশেরই নয়, একজন জ্যাঁ কুয়ে পুরো বিশ্বেরই অহংকার। যুগে যুগে, দেশে দেশে জন্ম গ্রহণ করুক আপনার মতো একজন ছিনতাইকারী, একজন জ্যাঁ কুয়ে, মানুষেরই জ্যাঁ কুয়ে।

Collected
Similar Topics

প্রশ্ন: “রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘন্টা রাজছে[…]

প্রশ্ন: অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়- এ প্র[…]

৫৬। ব্লু বুকস কী? নীল মলাটে বাধানো ইংল্যান্ডেরব্যব[…]