Let's Discuss!

সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য
#2538
৭৪৯ খ্রিঃ দামেস্ক কেন্দ্রীক উমাইয়া রাজবংশের পতনের মধ্যদিয়ে উথ্তান হয় বর্তমান ইরাকের বাগদাদ কেন্দ্রীক আব্বাসীয় সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিক ভাবে মক্ক-মদীনা আব্বাসীয়দের অধীনে চলে যায়। এবং উক্ত অঞ্চলে গোত্রীয় শাসনের ধারা পুনরায় ফিরে আসে। বিশেষ করে, হাশেমী গোত্রের লোকেরা হেজাজ অঞ্চলে আধিপত্ব বিস্তার করতে শুরু করে। কেননা আব্বাসীয় রাজবংশের ধারা মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনু হাশেমী গোত্রে থেকে প্রবাহিত। অপরদিকে উমাইয়ারা ছিল কুরাইশ বংশের অন্য একটি শাখা- উমাইয়া গোত্র হতে।
৮৩৩ খ্রিঃ আব্বাসীয় খিলাফতের শেষ পরাক্রমশালী শাসক আল মামূনের মৃত্যুর হয়। এর পর থেকে আব্বাসীয় খিলাফতের শৌর‌্যবীর‌্য কমতে থাকে। বিশেষ করে বুয়াইয়া ও সেলাজুক তুর্কীরা আব্বাসীয় খলিফাদের উপর এমনভবে প্রভাব ফেলতে থাকে, যার ফলে আব্বাসীয়দের ক্ষমতা বিলুপ্ত প্রায়। অর্থাৎ নামে মাত্র তারা খলিফা থাকতো এবং শাসনকার‌্য পরিচালনা করতো বুয়াইয়া কিংবা সেলাজুক তুর্কীরা।এদের মাঝে কেউ খলিফার উজির হয়ে আবার কেউ স্বাধীন সুলতান রুপে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করত।
আব্বাসীয়দের দুর্বলতার সুযোগে ৯৬৭ খ্রিঃ হাশেমীয়রা হেজাজে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই রাষ্ট্রটি মূলত মক্কা এবং মদীনাকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। যদিও এটি স্বাধীন ছিল না, তবে স্বায়িত্ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে তারা আব্বাসীয়,ফাতেমীয়,আয়ুবী, উসমানীয় খিলাফতের প্রতিনিধি হিসেবে মক্কা-মদীনা তথা হেজাজ শাসন করতো।
মক্কা-মদীনার রক্ষণাবেক্ষণ ও শাসন করতো বলে এই হাশেমীয় গোত্রের শাসকদের “ শরিফ” বলে অভিহিত করা হত। তারা ছিল মহানবী সাঃ এর নাতী হযরত হাসান রাঃ-এর বংশধর। ৯৬৭ খ্রিঃ তাইমুন নামের জৈনক শাসক প্রথম মক্কার শরীফত লাভ করেন। তিনিই মক্কা-মদীনা কেন্দ্রিক হেজাজ রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে প্রথম প্রচেষ্টা চালান। ১২০১ খ্রিঃ মক্কার শরীফ কাতাদাহ ইবনে আলী হেজাজের বাকি অঞ্চল গুলোও অর্থাৎ- জেদ্দা,তায়িপ,তাবুক,বদর ইত্যাদি হেজাজ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেন।
১২৫৮ খ্রিঃ কুখ্যাত মোঙ্গল শাসক হালাকু খার বাগদাদ আক্রমণের মধ্য দিয়ে আব্বাসীয় বংশের পতন ঘটে। এর পর ইসলামী সাম্রাজ্য এবং খিলাফত ভেঙ্গে চুর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে। মুসলমানদের মাঝে ঐক্য বিনিষ্ট হয়ে যায় এবং সুবিশাল মুসলিম সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়।
এই ভাঙ্গাগড়ার মধ্যদিয়ে উসমানীয় তুর্কীদের উত্থান। যারা ইসলামের ঝান্ডা এশিয়া,আফ্রিকা এবং ইউরুপের আকাশে উড়িয়েছিল। ১৫১৭ খ্রিঃ মামলুক সুলতানকে পরাজিত করে উসমানীয় তুর্কী সুলতান প্রথম সেলিম হেজাজকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এবং তার শাসনামল থেকে আব্বাসীয় সুলতানদের পরিবর্তে উসমানীয় সুলতানরা মুসলিম বিশ্বের খলিফা রুপে অধিষ্টিত হয়। উসমানী শাসনামলের শুরুতে মক্কার শরীফ ছিলেন- বরকত এফেন্দি।
এই সময় ক্রমন্বেয়ে হেজাজ,নজদ, আল হাসা সহ বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রের সব রাজ্য এবং ফিলিস্তিন সহ সমগ্র আরব বিশ্ব উসমানীয়দের অধীনস্থ হয়। এর পর অনেকটা বছর কেটে যায়। অবশেষে পরাক্রমশালী উসমানীয়দের ভাগ্যকাশে কালো-মেঘের ঘনঘটা দেখা দেয়। অযোগ্য শাসকদের কবলের মুখে এবং অমুসলিমদের ষড়যন্ত্রে ফলে ক্রমেই উসমানীয় সাম্রাজ্যও দুর্বল হতে থাকে।এবং এই দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রের উত্থানের পথ সুগম হয়।
পূর্বেউল্ল্যেখিত প্রাচীন মধ্য আরবের অন্যতম প্রদেশ ছিল হেজাজ এবং নজদ। হেজাজ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অনুগত শরীফদের অধীনে। আর নজদেই বর্তমান সৌদি রাজবংশের উথ্তান। ইতিহাসে সৌদি রাষ্ট্রের উথ্তানকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম সৌদি রাষ্ট্(দিরিয়া আমিরাত):- বর্তমান সৌদি রাজবংশের পূর্বপুরুষ মুহাম্মদ বিন সউদ ছিলেন রিয়াদের নিকটস্থ দিরিয়া নামক একটি কৃষিবসতির প্রধান। তিনি অদম্য মরুযোদ্ধা ছিলেন।
উল্লেখ্য, রিয়াদ সৌদি আরবরে বর্তমান রাজধানী এবং নজদ অঞ্চলের আর-রিয়াদ প্রদেশের অংশ, এবং আরব উপদ্বীপের মধ্যভাগের মালভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। ১৭৪৪ সালে তিনি আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করেন। তাঁর সহায়তায় উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে ‘দিরিয়া আমিরাত’ নামে স্বতন্ত্র একটি ছোট্ট রাজ্য গঠন করেন। সেটিই প্রথম সৌদি রাজ্য। সে রাজ্য গঠিত হয়েছে ইসলামের নামে এবং শিরক ও বিদআতমুক্ত বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সউদের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হন। ১৭৯২ সালে ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্টাতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের ইন্তেকাল হয়। আব্দুল আজিজ ছিলেন দক্ষ কূটনীতিবীদ । তিনি একদিকে যেমন ওয়াহাবী মতবাদকে কাজে লাগিয়ে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন অপরদিকে ইসলামের শত্রু বৃটিশদের সাথে হাত মিলিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন।
১৮০১-১৮০২ সালে আবদুল আজিজ উসমানীয় খিলাফতের কাছ থেকে ইরাক দখল করে নেন। এরপর ১৮০৩ সালে আবদুল আজিজ মৃত্যুবরণ করেন। আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সউদ বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতায় আসেন এবং তুর্কিদের পরাজিত করে ১৮০৩ সালে হিজাজের প্রধান শহর মক্কা ও ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করে নেন।
এর ফলে উসমানীয় শাসক দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮০৮ খ্রিঃ মিশররে গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশার পুত্র ইবরাহিম পাশার নেতৃত্বে সৌদি বংশের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এতে সৌদি বংশ প্রায় নির্মুল হয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্র(নজদ আমিরাত): অদম্য সৌদিরা পরাজিত হলেও বারবার রুখে দাড়ায়। দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন তুর্কি বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সউদ। উল্লেখ্য, তুর্কি বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সউদ ছিলেন মুহাম্মদ বিন সৌদের নাতী অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ সৌদের পুত্র। অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রাণান্ত লড়াই করে তিনি পুনরায় আরব ভূখণ্ডে আরবীয়দের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনেন।
১৮১৮ সালে দিরিয়ায় প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের পতন হলে নিহত আবদুল্লাহর ‘তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ’ নামে এক ছেলে মরু অঞ্চলে পালিয়ে যান এবং বনু তামিম গোত্রে আশ্রয় নেন। পরে ১৮২১ সালে তিনি আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে এসে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তুর্কি বিন আবদুল্লাহ ১৮২৪ সালে উসমানিয়াদের নিয়োজিত মিসরীয় শাসকদের হটিয়ে আবার দিরিয়া এবং সঙ্গে রিয়াদ দখল করে নেন। রিয়াদকে রাজধানী করে ‘নজদ আমিরাত’ নামে ইতিহাসের দ্বিতীয় সৌদি রাজ্য গঠন করেন তিনি।
১৮৩৪ সালে তুর্কি বিন আবদুল্লাহ মৃত্যু হলে তার ছেলে ছেলে ফয়সাল নজদ আমিরাতের শাসক নিযুক্ত হন। এর পর সৌদি শাসকদের বড় প্রতিদ্বন্দিতার মুখে পড়তে হয়। একদিকে নজদের রিয়াদকেন্দ্রিক যেমন সৌদি বংশের উথ্তান তেমনি অপরদিকে নজদের উত্তরে হাইল শহরকে কেন্দ্র করে প্রথম আমীর আব্দুল্লাহ ইবনে আল রশিদ রশিদীয় বংশ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের গঠিত রাষ্ট্র “হাইল আমিরাত“ নামে পরিচিত।
রশিদীয়রা ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অনুগত অপরদিকে সৌদিরা ছিল উসমানীয়দের বিপক্ষে।
অতঃপর নজদে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সৌদ বংশ এবং রশিদীয় বংশের মাঝে অনিবারর‌্যভাবে সংঘাত সৃষ্টি হয়। সংঘাতের একপর‌্যায়ে ১৮৯১ সালে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হয় মুলায়দার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে উসমানিয়দের অনুগত রাশিদি বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় সৌদি আমিরাতের পতন ঘটে। ক্ষমতা চলে যায় উসমানি অনুগত শাসক মুহাম্মাদ বিন রশিদের হাতে।
ফলে তৎকালীন সৌদিদের শেষ উত্তরসূরি আবদুর রহমান বিন ফয়সাল তাঁর সহচরদের নিয়ে পালিয়ে যান। বিস্মৃত উষর বালুকাময় ‘রুব আল খালি’ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আবদুর রহমান তাঁর ছেলে আবদুল আজিজকে নিয়ে দক্ষিণ-পূর্বের মুররা নামক বেদুইন গোত্রে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আব্দুর রহমান তার ছেলে আব্দুল আজিজকে নিয়ে কুয়েতের আল সাবা রাজপরিবারে আশ্রয় গ্রহন করেন। [চলমান……..]
====================
মো: এমরান হোছাইন।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,চ.বি।
    Similar Topics
    TopicsStatisticsLast post
    0 Replies 
    491 Views
    by rekha
    0 Replies 
    235 Views
    by KOUSHIK2424
    0 Replies 
    227 Views
    by KOUSHIK2424
    0 Replies 
    257 Views
    by Rabeyaakther16
    0 Replies 
    264 Views
    by Jakiyasoc14

    ১. ডিজিটাল প্রতারণার সাজা ৫ বছর বা ৫ লক্ষ বা উভয় […]

    ১. বিশ্বে চার ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে[…]

    ১. ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত[…]

    যদি স্বাধীনতা বলতে কিছু বোঝায়, তবে এর অর্থ লোকেরা[…]