Get on Google Play

লিখিত পরীক্ষা বিষয়ক
#1918
"ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি(Debt Trap Diplomacy) কিঃ
চীনের উত্থানের সাথে ইদানীং ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি বা Debt Trap Diplomacy এর ব্যাপারটা আলোচনায় উঠে এসেছে । এই কূটনীতিতে ঋণদাতা দেশগুলো তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরনে ঋণকে ব্যবহার করে থাকে। ঋণদাতা দেশ ঋণের বোঝাকে ব্যবহার করে কৌশলগত সম্পদ অর্জন করতে পারে, যেমন বন্দর বা রাজনৈতিক প্রভাব। এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের মতো এটি নয়, চীনা ঋণের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ জামানত রাখতে হয়, যেসব সম্পদের দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ মূল্য আছে। বর্তমানে এই ঋণ-ফাঁদের কূটনৈতিক কৌশল চীন এতটাই ‘শিল্পের’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যে, অনেক দেশই এখন তাদের কাছ থেকে যেকোনো ধরনের ঋণ নিতে ভয় পায়। ঋণের ফাঁদে অবশ্য তুলনামূলক দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই বেশি পড়ে, যেখানে শাসকের ‘ফাঁপা’ উন্নয়নের বুলি ও সাময়িক উন্নয়নের জোয়ার বেশি দেখানো হয়। চীন মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে থাকে এবং উন্নয়নের নামে ঋণ নিতে উৎসাহিতও করে দেশটি। গরীব বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণ অকাতরে দিতে থাকে চীন, এমনকি পূর্বের ঋণ শোধ না হলেও তারা কোনো কার্পণ্য করে না নতুন করে ঋণ দিতে। এই সুবিধা অবশ্য নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত চলে। এরপর যখন ঋণের পরিমাণ এমন একটা পর্যায়ে চলে যায় যে, ঐ দেশ আর তা পরিশোধ করার মতো অবস্থায় থাকে না, ঠিক তখনই চীনের আসল রূপ বেরিয়ে আসে, তৈরি হয় ঋণ-ফাঁদ এবং আদায় করে নেওয়া হয় বিভিন্ন সুবিধা ও অন্যায্য দাবি দাওয়া ।
ঋন ফাদ কৌশল কি নতুন কিছুঃ
Debt Trap এই কৌশলটি কিন্ত বেশ পুরনো। এর সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল প্লানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে । মার্শাল পরিকল্পনা (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় পুণর্গঠন প্রকল্প নামে পরিচিত, ইআরপি) ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে সহায়তা প্রদান করার একটি মার্কিন পরিকল্পনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোর বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং এসব দেশে সোভিয়েত কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করার লক্ষ্যে এ পরিকল্পনা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।এ পরিকল্পনা ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রণয়ন করা শুরু হয় এবং চার বছর যাবৎ পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলসমূহ পুনর্গঠন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করা, শিল্পে আধুনিকায়ন এবং পুনরায় একটি সমৃদ্ধ ইউরোপ সৃষ্টি করা। মুলত এর মাধ্যমেই ইউরোপের দেশগুলোকে কমিউনিজম এর দিকে ঝুকে পড়া থেকে রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে আধুনিক ঋনের ফাদ নিয়ে হাজির হয়েছে চীন।
ঋণের ফাদের প্রধান অস্ত্র বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভঃ
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের সঙ্গে প্রায় ৭০টি দেশের সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার হবে।ব্যয় হতে পারে এক লাখ কোটি ডলার। এরই মধ্যে ২১ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছে চীন, যার সিংহভাগই হয়েছে এশিয়ায়। আর এই প্রকল্পের কাজগুলো একচেটিয়াভাবে করছে চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোই।বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সংযুক্ত হওয়া নিয়ে উভয়সংকটে আছে মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার অনেকগুলো দেশ। এত বড় প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়ন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, চীনের এই প্রস্তাবে রাজি না হলে, সি চিনপিংকে অগ্রাহ্য করার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে! সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে চীন। আটকে যাচ্ছে ঋণের ফাদে ।
প্রথম শিকার শ্রীলংকাঃ
শ্রীলঙ্কা ১১০ কোটি ডলারের বিনিময়ে হাম্বানটোটা বন্দর বিষয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে। গভীর সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে চুক্তি করে দেশটি।চুক্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্র মালিকানাধীন একটি চীনা কোম্পানি ৯৯ বছরের জন্য বন্দর এবং তার সংলগ্ন ১৫ হাজার একর জমি শিল্পাঞ্চল তৈরির জন্য ইজারা নেবে। এর আগে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর উন্নয়নে দেশটিকে কয়েকশ' কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল চীন৷ কিন্তু একসময় শ্রীলঙ্কা সেই ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে ওঠায় ২০১৭ সালে বন্দরটি চীনের হাতে তুলে দেয়৷
ঋণের ফাদে কেনিয়াঃ
চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে কেনিয়া সরকার। সময়মতো যদি চীনের ঋণ পরিশোধ করা না হয় তাহলে দেশটির প্রধান সমুদ্রবন্দর মমবাসা পোর্টের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছরের মধ্যে কেনিয়াকে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
এ বছর জুনে চীনের দেওয়া পাঁচ বছরের ‘গ্রেস টাইম’ শেষ হয়ে যাবে। ফলে জুলাই থেকে কেনিয়াকে প্রতি বছর আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে।একটি চুক্তিপত্রে দেখা যায়, চীনের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ২০০ কোটি ইউরো যদি কেনিয়ার ন্যাশনাল রেলওয়ে কর্পোরেশন সময়মতো পরিশোধ করতে না পারে তবে চীন সরকার দেশটির মমবাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। কেনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বন্দর এটি ।
ঋণের ফাদে খোদ ইউরোপঃ
চীনের বিনিয়োগের ফাঁদে পড়ে ঋণে ফেঁসে গেছে ইউরোপের ৭ দেশ। বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায় চীনের দেয়া বড় অংকের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে এসব দেশ।চীনের বিনিয়োগের জালে ফেঁসেছে আলবেনিয়া, বসনিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, মেসিডোনিয়া ও মন্টিনিগ্রো। ওয়াশিংটনভিত্তিক আইএমএফ বলছে, ২০১৫ ও ২০১৭ সালের মধ্যে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে এসব দেশ।আইএমএফের তথ্যানুসারে, জিডিপিতে ঋণের পরিমাণ আলবেনিয়ার ৬৯.৯২ শতাংশ, বসনিয়ার ২৬, বুলগেরিয়ার ২২.৭, ক্রোয়েশিয়ার ৭৮, কসোভোর ১৬.৬৩, মেসিডোনিয়ার ৩৮.৭ ও মন্টিনিগ্রোর ৬২.৫ শতাংশ।
ঋণের ফাদে পাকিস্তানঃ
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) অধীনে ঋণ হিসেবে পাকিস্তানে ১৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এ ঋণের পরিষ্কার কোনো হিসাব না থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ১৯ বিলিয়নই চীনের কাছ থেকে পাওয়া। জাপানকে অতিক্রম করে চীনই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। সিপিইসির অধীনে পাওয়া এসব ঋণের জন্য চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হবে পাকিস্তানকে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার চীনের আর্থিক সহযোগিতায় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে গদর বন্দর বানাচ্ছে পাকিস্তান। গদর বন্দরসহ বিভিন্ন নির্মীয়মাণ প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে ১ হাজার কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে পাকিস্তান।ধারনা করা হচ্ছে হাম্বানটোটার মত গওদর বন্দরকে ইজারা দিতে পারে চীনের কাছে ।
বাংলাদেশ কি ঋণের ফাদে পড়তে যাচ্ছেঃ
২০১৬ সালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগত আংশীদারিত্বে পরিণত করে চীন ও বাংলাদেশ। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে বেইজিং ও ঢাকা ২১৫০ কোটি ডলারের বিভিন্ন চুক্তি সই করেছে, যার আওতায় রয়েছে বহু জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্প। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে রেকর্ড হারে। ওই বছর দেশটিতে প্রায় ৩৬০ কোটি ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি। এই অংকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অবশ্য চীনের একার, যা ১০০ কোটি ডলারের চেয়েও বেশি।অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বাংলাদেশ ঋণের জালে পড়ছে, এমনটা বলার সময় এখনও আসেনি। ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের সামগ্রিক বহিঃঋণের পরিমাণ ছিল ৩৩১০ কোটি ডলার। কিন্তু সেই হিসাবে চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের অংশ তেমন বড় নয়।তবে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
উপসংহারঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের সময় থেকে আমেরিকা যেভাবে আগের ইউরোপীয় কলোনি শক্তিগুলোর কাছ থেকে দুনিয়ায় অর্থনৈতিক পরাশক্তির কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল, আর সে জায়গায় নিজ নেতৃত্বের এক নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়ম শৃঙ্খলা চালু করে নিয়েছিল ঠিক সেটারই তুলনীয় এক পুনরাবৃত্তির সময়কাল এটা যখন চীন এবার আমেরিকার স্থান নিতে যাচ্ছে, তা বলা যায়। এটা এক পালাবদলের যুগ, সারা দুনিয়ার মধ্যে যার মুখ্য পালামঞ্চ হলো এশিয়া। সার কথায় এটা আমেরিকার ধীরে ধীরে প্রস্থান, আর সে জায়গায় চীনের আগমন ও উত্থান। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদূর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে ততটাই সেই গ্যাপ পূরণ করে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এদিকে এই মূল লড়াইয়ের সাইড-ওয়ার্ক হিসেবে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, এ কাজে বাড়তি সুবিধা পেতে ভারতকে সঙ্গী হিসেবে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

Collected

    SSJ GREEN MATERIALS LTD is the largest & t[…]

    জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ মোতাবেক রজনীগঞ্[…]

    সরকারি বিধি মোতাবেক বাড়াইর হাজী চেরাগ আলী উচ্চ ব[…]

    বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠা[…]