বিষয়ভিত্তিক নয় কিন্তু প্রস্তুতির সাথে সম্পর্কযুক্ত
#1673
উসমান সিদ্দিকী ছিলেন হায়দ্রাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম। তিনি ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ শাসন করেছেন। এরপর অপারেশন পোলোর ফলে হায়দ্রাবাদ ভারতের অংশ হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তাকে হায়দ্রাবাদ রাজ্যের রাজপ্রমুখ করা হয়। ১৯৫৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এসময় রাজ্যকে ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করে অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের অংশ করা হয়।

নিজাম শব্দের মূল অর্থ হল সৎ। তার শাসনামলে সে সততা আর কৃপণতার জন্য সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সেসময় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

🎯ব্যক্তিগত জীবনঃ- তিনি তার ১৩ বছর বয়স থেকে শুরু করে বাকি জীবন কিং কোঠি প্রাসাদে কাটিয়েছেন। সিংহাসনে আরোহণের পরও তিনি চৌমহল্লা প্রাসাদে যাননি।

১৯২০ সালের ১৪ এপ্রিল উসমান আলি খানের সাথে তার প্রথম স্ত্রী আজমাতুন্নিসা বেগমের বিয়ে হয়। আজম জাহ ও মুয়াজ্জাম জাহ তাদের পুত্র। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন ইকবাল বেগম। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আজম জাহর সাথে শেষ উসমানীয় খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদের কন্যা দুররু শেহভারের বিয়ে হয়। মুয়াজ্জাম শাহ উসমানীয় রাজকুমারি নিলুফারকে বিয়ে করেন। তার ১৮ জন পুত্র ও ১৯ কন্যা সন্তান রয়েছে।

🎯শাসনকালঃ-উসমান আলি খান তার পিতার মৃত্যুর পর ১৯১১ সালে নিজাম হন। ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে হায়দ্রাবাদ রাজ্য ছিল দেশীয় রাজ্যসমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ। এর আয়তন ছিল ৮৬,০০০ বর্গ মাইল (২,২৩,০০০ বর্গ কিমি) যা বর্তমান যুক্তরাজ্যের প্রায় সমান। হায়দ্রাবাদের শাসককে ভারতে সবচেয়ে উচু মর্যাদা সম্পন্ন রাজন্য হিসেবে গণ্য করা হত। যে পাঁচজন দেশীয় রাজা ২১টি গান স্যালুট পেতেন হায়দ্রাবাদের শাসক ছিলেন তাদের অন্যতম। তার নিজাম উপাধি ছিল অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করায় তাকে ব্রিটিশ সিংহাসনের বিশ্বস্ত মিত্র ঘোষণা করা হয়েছিল।

🎯ধনঃ-নিজাম থাকাকালীন সময় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হত। ১৯৪০ এর দশকের শুরুর দিকে তার ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ ছিল বলে জানা যায়।সেসময় নবগঠিত ভারতীয় ইউনিয়ন সরকারের কোষাগারের রিপোর্ট মোতাবেক বার্ষিক রাজস্ব ছিল এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি বর্ণনা করে প্রচ্ছদে তার ছবি ছাপা হয়। ধারণা করা হয় যে ১৯৬৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। যাইহোক, সে সময় তার সম্পদ এক বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে কারণ এটি বেশিরভাগই ভারত সরকার দ্বারা সরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

এটি গোলকোন্ডা খনি যা নিজামের বিশাল সম্পদ রাজস্বের মূল উৎস ছিল (ভূমি রাজস্বের বিপরীতে - যা অধিকাংশ রাজাদের সাথে সাধারণ)। হাইড্রাবাদ এবং বেরার এই রাজত্ব ছিল 19 ম শতাব্দীতে বিশ্বের বাজারে হীরাগুলির একমাত্র সরবরাহকারী।

🎯প্রধান উন্নয়ন এবং সমাজে অবদান
উসমান আলি খান রাজ্যের সার্বভৌম শাসক ছিলেন। তাকে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখা হয়। তার ৩৭ বছরের শাসনামলে বিদ্যুত, রেলপথ, সড়ক ও বিমান ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রাজ্যের নিজামসাগর হ্রদ খনন করা হয় এবং তুঙ্গাভদ্রা নদীতে কিছু সেচ প্রকল্প চালু করা হয়।

হায়দ্রাবাদ শহরের প্রায় সকল সরকারি ভবন যেমন উসমানিয়া জেনারেল হাসপাতাল, হায়দ্রাবাদ উচ্চ আদালত, আসাফিয়া লাইব্রেরী (বর্তমানে স্টেট সেন্ট্রাল লাইব্রেরী), টাউন হল (বর্তমানে এসেম্বলি হল), জুবিলি হল, হায়দ্রাবাদ জাদুঘর (বর্তমানে স্টেট মিউজিয়াম), নিজামিয়া অবজারভেটরি এবং অন্যান্য অনেক স্মৃতিস্থাপনা তার শাসনামলে নির্মিত হয়। বাজেটের ১১% শিক্ষায় ব্যয় হত। এসময় উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য স্কুল, কলেজ ও একটি অনুবাদ বিভাগ চালু করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং দরিদ্রদের জন্য তা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

তিনি দিল্লিতে হায়দ্রাবাদ হাউস প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমানে এটি ভারত সরকারের কূটনৈতিক বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হয়। তিনি অস্ট্রেলীয় নৌবাহিনীর জন্যও অর্থ প্রদান করেছেন।

🎯শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার
মারাঠওয়াডা অঞ্চলে কৃষি গবেষণা তিনি চালু করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার পর ভারত সরকার তার চালু করা এসব সুযোগ সুবিধাকে আরো উন্নত করে।

উসমান আলি খান ভারতে ও ভারতের বাইরে অনেক প্রতিষ্ঠানে অর্থ দান করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জামিয়া নিজামিয়া, দারুল উলুম দেওবন্দ, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়।

🎯কৃপণতা

তাঁর মতো কৃপণ আর দ্বিতীয় কেউ ছিল কিনা সন্দেহ। মুদি দোকানি থেকে দর্জির— সকলের সঙ্গে দরদাম নিয়ে তর্ক বাঁধত তাঁর। রোগা পাতলা চেহারার স্যার মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি। অবিভক্ত ভারতের হায়দরাবাদের শেষ নিজাম ছিলেন তিনি। অথচ এরকম কৃপণ মানুষেরই টেবিলে পড়ে থাকত হাজার কোটি টাকার পেপার ওয়েট। সিদ্দিকির ছবি টাইম ম্যাগাজিনের মতো পত্রিকা তাদের কভারে ছেপেছিল। কভারের ওপর ছাপা অক্ষরে লেখা ছিল ‘দ্য রিচেস্ট ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’।
একান্তই অসুবিধা না হলে নতুন জামাকাপড় ঢুকত না ঘরে। পুরনো জামা বংশপরম্পরায় পরাই ছিল রেওয়াজ। ছেঁড়া ফাটা জামা নিজের হাতে সেলাই করেই পরতেন। মাঝেমধ্যে যাও বা দর্জির কাছে যেতেন, সেখানে গিয়ে দাম নিয়ে লাগত তর্কযুদ্ধ। সস্তা সিগারেট খেতেন। চেয়েও খেতেন মাঝেমধ্যে। অথচ টেবিলে রাখা পেপার ওয়েটটির বর্তমান বাজার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। ১৮৫ ক্যারেটের আস্ত জ্যাকব ডায়মন্ডটাই ছিল তাঁর পেপার ওয়েট। তাঁর গ্যারেজে থাকত রোলস রয়েসের ৫০টিরও বেশি মডেল। এমনকী তাঁর কাছে এত মুক্তো ছিল যে, একটা আস্ত স্যুইমিং পুল ভর্তি হয়ে যেত। তাঁর অধীনস্থ হায়দরাবাদ ও বেরার রাজ্যের আয়তন ছিল ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের আয়তনের সমান।
‘নিজাম নেকলেস’-এর কথা হয়তো অনেকেই জানেন। রানী এলিজাবেথের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় রাখা ছিল কয়েক কোটি টাকা দামের সেই নেকলেস। রানীর বিয়েতে সেই হীরের নেকলেসটি পাঠিয়েছিলেন মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকিই। ১৯৪০ সালে ফরচুন পত্রিকার দেওয়া রিপোর্টে তাঁর সম্পত্তির মূল্য ছিল ২৯ হাজার কোটিরও বেশি। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সবথেকে ধনী ব্যক্তি।

🎯দানশীলতা

তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দান করে গেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দিয়েছিলেন পাঁচ টন সোনা। ১৯০৮ সালের মহান মুসি বন্যার পর, আনুমানিক ৫০০০০ জন মানুষকে হত্যা করে, ওজমান সাগর ও হিমায়াত সাগরের আরেকটি বড় বন্যা প্রতিরোধের জন্য নিজাম দুটি হ্রদ নির্মাণ করেন। প্রাক্তন তার নামকরণ করা হয়, এবং পরে তার পুত্র আজম জহির মীর হিমায়াত আলী খান পরে। ১৯৪১ সালে তিনি রাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে নিজের ব্যাংক, "হায়দ্রাবাদ স্টেট ব্যাংক" (পরে ২০১৭ সালে ভারতের স্টেট ব্যাংকের সাথে মিলিত) তৈরি করেন। এটি হায়দ্রাবাদ স্টেট ব্যাংক অ্যাক্টের অধীনে ৮ আগস্ট, ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ব্যাংকটি ওসমানিয়া মুদ্রায় হায়দ্রাবাদের মুদ্রা পরিচালিত করে।
এটি ভারতের একমাত্র রাজ্য ছিল যার সাথে মুদ্রা ছিল (মুদ্রা) - হায়দ্রাবাদ রুপি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের সময় দেশীয় রাজ্যসমূহ ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো একটিতে যোগ দেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়। এসময় নিজামের শাসনাধীনে প্রায় ১৬ মিলিয়ন জনগণ এবং ৮২,৬৯৮ বর্গ মাইলের অঞ্চল ছিল। নিজাম ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ দেয়ার পক্ষে ছিলেন না। তিনি ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মধ্যে হায়দ্রাবাদকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে চেয়েছিলেন।

শেষপর্যন্ত ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার হায়দ্রাবাদ দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানের নাম দেয়া হয় অপারেশন পোলো। মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরীর অধীনে এক ডিভিশন ভারতীয় সেনা ও একটি ট্যাঙ্ক ব্রিগেড হায়দ্রাবাদে আক্রমণ চালায়। আগ্রাসী ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধে নিজামের বাহিনী ও নিজামের সরকারী বাহিনীর সহায়তাকারী গণ মুক্তিফৌজকে পরাজিত করে।

🎯শেষ জীবনঃ- উসমান আলি খান ১৯৬৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তার জানাজা ভারতের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জানাজাসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল।

আনুমানিক ১০ লাখ মানুষ নিজাম বন্দুক-কার্ট মিছিলের অংশ হয়ে উঠেছে। নিযামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছিল ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অ-ধর্মীয়, অ-রাজনৈতিক সমাবেশ।

Collected

সাধারণ জ্ঞান। কারও কাছে আগ্রহের বিষয়, কারও-বা ভয়[…]

NSI সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা পরীক্ষার[…]

যারা হঠাৎ সমাস নির্ণয়ে গুলিয়ে ফেলেন—আশা রা[…]

সুদকষা

১. যখন মূলধন,সময় এবং সুদের হার দেওয়া থাকে তখন- স[…]

মোবাইল থেকে বিডিচাকরি খুব সহজে ব্যবহার করার জন্য