বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি : বাংলদেশ ও বিশ্ব, দৈনন্দিন বিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি
#1359
Shafiqul Islam Chowdhury

আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক কর্তৃক রপ্তানিকৃত পণ্যের মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আমদানিকারকের পক্ষে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এল সি) খোলার প্রচলন হয়।

লেটার অব ক্রেডিট বা ঋণপত্র হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ঋণপত্র ইস্যুকারি ব্যাংক রপ্তানিকারকের প্রতি এই মর্মে অপ্রত্যাহারযোগ্য নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, যদি রপ্তানিকারক বা ঋণপত্রের বেনিফিশিয়ারি ঋণপত্রে বর্ণিত শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঋণপত্রে নির্দিষ্ট মূল্যের ভিত্তিতে ঋণপত্রে উল্লেখিত পরিমাণ পণ্য বা সেবা রপ্তানি করে ঋণপত্রে বর্ণিত শর্ত পূরণ এর পক্ষে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (যেমন: ইনভয়েস, প্যাকিংলিষ্ট, পরিবহন দলিল, বিল অব এক্সচেঞ্জ, কান্ট্রি অব অরিজিন ইত্যাদি) ঋণপত্র ইস্যুকারি ব্যাংক বা তার মনোনীত কোন ব্যাংকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে তাহলে ঋণ ইস্যুকারি ব্যাংক ঋণপত্রের বেনিফিশিয়ারকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। তাই রপ্তানিকারক এল সি-এর মাধ্যমে তার পণ্যের মূল্য প্রাপ্তি সম্পর্কে যেমন নিশ্চিন্ত হতে পারে তেমনি আমদানিকারকও এল সি-এর বিপরীতে পণ্য প্রাপ্তির পর রপ্তানিকারককে পণ্য মূল্য পরিশোধ করতে পারে।

লেটার অব ক্রেডিটের ধরন

প্রধানত: লেটার অব ক্রেডিট (ইররিভোকেবল) অপ্রত্যাহারযোগ্য প্রকৃতির হয়ে থাকে। এছাড়াও অন্য যেসব ধরনের এল সি হয়ে থাকে তা হচ্ছে:

১. ট্রান্সফারেবল এল সি

২. ব্যাক টু ব্যাক এল সি

৩. রেড ক্লজ এর সি

৪. গ্রীণ ক্লজ এল সি

৫. উইথ রিকোর্স এল সি

৬. উইথাউট রিকোর্স এল সি

৭. রিভলভিং এল সি

৮. এ্যাট সাইট এল সি

লেটার অব ক্রেডিট-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পক্ষসমূহ এল সি-এর সঙ্গে জড়িত পক্ষসমূহ হচ্ছে:

ক. ইম্পোর্টার/বায়ার: যার অনুরোধে ব্যাংক এল সি খোলে তাকে এপ্লিকেন্ট বলে এবং তিনিই ইম্পোর্টার বা বায়ার।

খ. ইস্যুয়িং ব্যাংক: যে ব্যাংক ইম্পোর্টার-এর পক্ষে এল সি খোলে তাকে ইস্যুয়িং ব্যাংক বলে।

গ. রপ্তানিকারক/বিক্রেতা/বেনিফিশিয়ারি: যে পক্ষের অনুকূলে এল সি খোলা হয়ে থাকে রপ্তানিকারক/ বিক্রেতা/ বেনিফিশিয়ারি বলে।

ঘ. এডভাইজিং/নোটিফাইং ব্যাংক: রপ্তানিকারকের দেশে অবস্থিত যে ব্যাংকের মাধ্যমে এল সি এডভাইস পাঠানো হয় তাকে এডভাইজিং ব্যাংক বলে।

ঙ. কনফার্মিং ব্যাংক: যে ব্যাংক ইস্যুয়িং ব্যাংকের অনুরোধে এল সি-তে তার নিশ্চয়তা (কনফার্মেশন) প্রদান করে তাকে কনফার্মিং ব্যাংক বলে। এটা এডভাইজিং ব্যাংকও হতে পারে।

চ. নেগোশিয়েটিং ব্যাংক: এটা এমন এক ব্যাংক (ঋণপত্রে উল্লেখিত ব্যাংক বা ঋণপত্রে উল্লেখ না থাকলেও যেকোন ব্যাংক) যেখানে ঋণপত্রের বেনিফিশিয়ারি উক্ত ঋণপত্রে নিদিষ্ট মূল্যের ভিত্তিতে ঋণপত্রে উল্লেখিত পরিমাণ পণ্য বা সেবা রপ্তানির স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস-এর বিপক্ষে ঋণ নিতে সক্ষম।

ছ. পেয়িং-রিইমবার্সিং ব্যাংক: যে ব্যাংকের উপর বিল এর মূল্য দেওয়া হয় তাকেই পেয়িং-রিইমবার্সিং ব্যাংক বলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইস্যুয়িং ব্যাংকই পেয়িং-রিইমবার্সিং ব্যাংক হিসেবে কাজ করে।

লেটার অব ক্রেডিট সাধারণ আলোচনা

আমদানি-রপ্তানির প্রতি পদে পদে ঝুঁকি বিরাজমান। রপ্তানিকারকের ভয় থাকে যদি ক্রেতা পণ্যের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হয়। আবার আমদানিকারকের ভয় থাকে অর্থ পেয়ে যদি বিক্রেতা মালামাল না পাঠায়। এক দেশ থেকে আরেক দেশে দূরত্বের কারণে বিরোধ নিষ্পত্তি করা সহজ হয়না। এসব ঝুঁকি এড়াতে পণ্যের ক্রয় বিক্রয়ে লেটার অব ক্রেডিট বা ডকুমেন্টরি ক্রেডিটের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এর মাধ্যমে বিক্রেতাকে এক ধরনের গ্যারান্টি প্রদান করা হয় যে, বিক্রেতা তার পণ্যের মূল্য নিশ্চিতভাবে বুঝে পাবে এবং ক্রেতা এই মর্মে নিশ্চিত হবেন যে, পণ্য তার জিম্মায় না পৌঁছানো পর্যন্ত কোন আর্থিক লেন-দেন সম্পন্ন হবে না। লেটার অব ক্রেডিট হচ্ছে মুলত: ব্যাংকের দেওয়া এক ধরনের গ্যারান্টি যে নির্দিষ্ট বিক্রেতা কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য তার প্রাপ্য সে ক্রেতার কাছ থেকে পাবে। ব্যাংক নিশ্চিত ক’রে বলে দেয়, ক্রেতা ঠিক কোন্ সময়ে কোন্ কোন্ কাগজ পত্রের ভিত্তিতে প্রাপ্য অর্থ পাবে। এর বিনিময়ে বিক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পাবার জন্য কঠোর শর্ত পালনের অঙ্গীকার গ্রহন করে থাকে। এর মধ্যে থাকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট- যেমন শিপিং-এর প্রমাণ পত্র-বিল অব লেডিং।

লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারে বিক্রেতার সুবিধা

ক্রয়-বিক্রয়ে লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারের ফলে ক্রেতা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন যে, সে কত টাকা পাবে বা কোন্ সময়ে পাবে। রপ্তানিকারকের কাছে লেটার অব ক্রেডিট অর্থ প্রাপ্তির নিরাপদ মাধ্যম। অবশ্য এজন্য তাকেও এল সি-তে বর্ণিত শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করতে হয়। অর্থ না পাবার ঝুঁকি এল সি-র ক্ষেত্রে ব্যক্তির থেকে ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

ক্রেতার সুবিধা

এল সি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রেতা নিশ্চিত হয় যে, বিক্রেতা তার শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করেছে কারণ প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে ডকুমেন্টরি এভিডেন্স ব্যাংকে জমা দিতে হয়। যেমন পণ্যের শিপমেন্ট হয়েছে কি-না তা বিল অব লেডিংস-এর মাধ্যমে প্রমাণ মেলে। যেহেতু বিল অব লেডিংস শিপিং কোম্পানি অর্থাৎ একটি তৃতীয় পক্ষ প্রদান করে, এখানে ক্রেতা শিপমেন্টের তারিখ নিয়ে ছল-চাতুরি করতে পারে না। তেমনি পণ্যের মানের ক্ষেত্রেও তৃতীয় পক্ষ ইন্সপেকশন কোম্পানি সনদপত্র প্রদান করলে তা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। কারণ অনেক সময় এল সি-তে এই সনদ পত্র জমা দেওয়ার বিধান থাকে এবং ব্যাংক এই সনদ পত্র ব্যতিত ক্রেতার প্রাপ্য অর্থ ছাড় করণের পদক্ষেপ গ্রহন করে না।

তবে মনে রাখা দরকার

লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারের ফলে ক্রেতা বা বিক্রেতা উভয়কেই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। লেটার অব ক্রেডিট প্রতিপালনের জন্য ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে চার্জ আদায় করে। রপ্তারিকারক হলে তাকে মনে রাখতে হবে লেটার অব ক্রেডিটে বর্ণিত সকল কার্যক্রম যথাযথভাবে পালন করলেই কেবল সে তার প্রাপ্য দাবি করতে পারে, অন্যথায় তার পাওনা আটকে যেতে পারে। লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারের ফলে পণ্য সরবরাহে দেরি হতে পারে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ি সকল আমদানি কেবল লেটার অব ক্রেডিটের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে। কিন্তু বিশে^ বেশির ভাগ দেশে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেডিট কার্ড, পে-পাল অথবা টি টি-র মত সহজ ট্রানজেকশন জনপ্রিয়। সেকারণে বেশির ভাগ দেশে এল সি সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন স্বচ্ছন্দ নয়। বাংলাদেশী আমদানিকারকেরা এতে রপ্তানিকারককে লেটার অব ক্রেডিটের বিষয়টি বোঝাতে হিমসিম খায়। বিশেষ ক’রে উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থ যাতে সহজে পাচার হয়ে যেতে না পারে সেজন্য এল সি-র মত পদ্ধতি বাধ্যতামুলক করে থাকে। লেটার অব ক্রেডিট সঠিক ডকুমেন্ট নিয়ে কাজ করে তবে সঠিক পণ্যের নিশ্চয়তা দেয়না।

লেটার অব ক্রেডিটের ধরন

-ইররিভোকেবল

-রিভোকেবল

-আনকনফার্মড

-কনফার্মড

-ট্রান্সফারেবল

অন্যান্য ধরনগুলো হচ্ছে:

-স্টান্ড-বাই

-রিভলভিং

-ব্যাক টু ব্যাক

রিভোকেবল এবং ইররিভোবেল এল সি

রিভোকেবল এল সি-ও ক্ষেত্রে যে ব্যাংক এল সি-টি ইস্যু করেছে সে ইচ্ছে করলে যেকোন সময়ে বা যেকোন কারণে তা বাতিল করতে পারে। তবে ইররিভোকেবল এল সি-র ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষ একমত না হলে এর কোন পরিবর্তন বা বাতিল করা যায় না।

কনফার্মড এবং আনকনফার্মড লেটার অব ক্রেডিট

ক্রেতা লেটার অব ক্রেডিট যে ব্যাংকে খোলে তাকে ইস্যুয়িং ব্যাংক বলে। বিক্রেতা চায় তার দেশের কোন ব্যাংক সেই লেটার অব ক্রেডিট সঠিক আছে কি-না তা পরীক্ষা ক’রে দেখুক। বাড়তি নিরাপত্তার জন্য বিক্রেতা চায় যে ব্যাংক (কনফার্মিং ব্যাংক) এটা পরীক্ষা করেছে তারা একটা নিশ্চয়তাও প্রদান করুক। এই নিশ্চয়তা দেওয়ার ফলে ইস্যুয়িং ব্যাংক যদি বিক্রেতাকে পণ্য মূল্য পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় তবে কনফার্মিং ব্যাংক তা পরিশোধ করবে। সেকারণে কনফার্মড লেটার অব ক্রেডিট সবসময় বিক্রেতাকে আনকনফার্মড লেটার অব ক্রেডিটের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা দেয়।

ট্রান্সফারেবল লেটার অব ক্রেডিট

ট্রান্সফারেবল লেটার অব ক্রেডিট একজন বেনিফিশিয়ারির কাছ থেকে অপর বেনিফিশিয়ারির কাছে হস্তান্তর করা যায়। এধরনের লেটার অব ক্রেডিট সাধারণতঃ মধ্যস্বত্ব ভোগী জড়িত থাকলে (ক্রয়-বিক্রয়ে) ব্যবহৃত হয়।

স্টান্ড-বাই লেটার অব ক্রেডিট

স্টান্ড-বাই লেটার অব ক্রেডিট হচ্ছে ব্যাংকের এই মর্মে নিশ্চয়তা দেওয়া যে, ক্রেতা পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম এবং বিক্রেতাকে সে মূল্য পরিশোধ করবে।

রিভলভিং লেটার অব ক্রেডিট

একটি রিভলভিং লেটার অব ক্রেডিট হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একাধিক দেনা-পাওনা মেটানোয় সক্ষম এক বিশেষ এল সি।

ব্যাক টু ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট

রপ্তারিকারকের অনুকূলে যখন এল সি খোলা হয় কিন্তু পণ্যাদি সরবরাহ করার মত প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের রপ্তানি এল সি টি সহায়ক জামানত হিসেবে রেখে এডভাইজিং ব্যাংকে বা তার দেশীয় কোন ব্যাংক পণ্যের মূল্য সরবরাহকারির অনুকূলে আর একটি এল সি খোলা হলে তাকে ব্যাক টু ব্যাক এল সি বলে। প্রথম এল সি-র প্রায় সব শর্তাবলি অবিকল অবস্থায় দ্বিতীয় এল সি-তে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সাধারণতঃ কোন রপ্তানি এল সি-র বিপরীতে ইউজেন্স ব্যাক টু ব্যাক এল সি খোলা হয়। তবে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফা- স্কীম (ই ডি এঅ এস)-এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে “ এট সাইট ব্যাক টু ব্যাক এল সি” খোলা হয়। দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে রপ্তানি সহায়তা (এক্সপোর্ট ইনসেনটিভ) হিসেবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রপ্তানিকারকদের ই ডি এফ সুবিধা প্রদান করে থাকে। এ সুবিধার আওতায় রপ্তানিকারক বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে রপ্তানির বিপরীতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমদানিকারককে ঋণ গ্রহনের তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে (অনুরোধে ২৭০ দিন) লাইবর রেটের চেয়ে ১% বাড়তি হারে গৃহিত ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশে তৈরী পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক টু ব্যাক এল সি-র মাধ্যমে পোশাক তৈরীর উপকরণাদি সংগ্রহ করে থাকে। রপ্তানিকারককে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ মোতাবেক ব্যাক টু ব্যাক এল সি খুলতে হয়।
Tense

ইংরেজি ভাষা শিখতে হলে Tense জানতে হয় সবার আগে। তা[…]

একবার একজন বিজনেস এক্সিকিউটিভ প্রচন্ড অর্থ সংকটে প[…]

"কল-রেডী" খুব পরিচিত একটা নাম। বঙ্গবন্ধু[…]

মোবাইল থেকে বিডিচাকরি খুব সহজে ব্যবহার করার জন্য